৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ০৮২০১৬
 
 ০৮/১২/২০১৬  Posted by
কবি জিললুর রহমান

কবি জিললুর রহমান

কবিতা কবিতা
– জিললুর রহমান

বিতা কাহাকে বলে? কে জানিতে চায়? কবিতা সবার কাছে দুর্বোধ্য প্রায়। যতই বলুক কবি – ‘এই কবিতা এমনি থাকুক সহজ এবং সুশিক্ষিতা’, কবিতা ততো বেশি জটিল ঘুলঘুলিতে হারিয়েছে পথ। কবিতা সুন্দর থেকে মুগ্ধবোধে জন্ম নিয়েছিলো, কবিতা স্বপ্নের ঘোরে প্রকৃতির গায়ে লেপ্টে ছিলো।

আদ্যিকালের লেখ্যভাষা অর্থাৎ পদ থেকে একদিন জন্মেছিলো পদ্য। পদ্য করে বিজ্ঞজনে নানান কথা বলতো। সুরে সুরে পাঠ হতো সে রাজার দরবারে, অন্তমিলে দুলিয়ে মাথা সপারিষদ শুনতো, বাহবা পেয়ে স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কারও মিলতো। এইভাবে দিন ভালোই ছিল, ছন্দ-মিলে কাটিয়ে কবি প্রহর করতো পার। ধীরে ধীরে বন্ধ হলো হাজার রাজ দরবার। সুরও আছে, ছন্দ আছে, কথার কী বাহার! কিন্তু কবির কদর যেন কমেছে দিন দিন।

কবির কদর কমলেও তার সংখ্যা গেছে বেড়ে, হাজার কবির মিলবে দেখা প্রতিটি শহরে। কেউবা তাদের পাগল ডাকে, কেউবা হুজুগে – কারও আবার পোয়াবারো, মিডিয়ায় ডাক পেয়ে। রাজার বাড়ির বাইরেও ভাই কাব্যলক্ষী আসে, কাহ্নপা-র সুন্দরীরা সেই মায়াতেই ভাসতো। ঘরে তাদের ভাত না থাকুক, আকাশ জুড়ে চাঁদ ছিলো, পাহাড়ের উপরে টিলায় মন ভুলানো সুখ ছিলো। নদীর বুকে ভাসতে ভাসতে ভাটিয়ালী সুর ছিলো – আর খরার বুকে হাহাকারে ভাওয়াইয়া গান ছিলো।

মধ্যিখানে ভাসালো দেশ বৈষ্ণব মতবাদে – বাউল ফকির কাব্য করলো মারফতি পদে পদে। পদ রচনার সাথে লাগলো সুর সাধনার খেলা – কাটলো কতো বেলা রে ভাই, মন ভাসানোর মেলায়। সেখানেও বাধ সেধেছে বৈদেশি বাতাস! ডিরোজিওর শিষ্যরা কী নতুন আলো জ্বালে! নতুন আলোর আভাস থেকে কাব্য পেলো কি?

যেদিন মধুসূদনও তাঁর হাত লাগালো কাব্যে, পয়ার গাঁথা শব্দগুলো জব্দ হলো খুব – মিত্রতাতো গেলো ঘুচে শব্দবন্ধের মধ্যে, অন্তমিলও হাহাকারে কোথায় পালালো তা আর কে বুঝবে! ‘বারো হাত কাঁকুরের তেরো হাত বিচি’ বেশে ছুটলো সমালোচনা, বৈয়াকরণ নির্ণিমেষে আয়তলোচনা।

পাঠকেরা হোঁচট খেতে খেতে নতুন ছন্দে মাতলো। পয়ার ছাড়া বাংলা ভাষা অমিত্রাক্ষরে হাঁটলো – নতুন মহা কাব্যলক্ষী, নতুন যুগের প্রেরণা, ছন্দ আছে কিন্তু তাকে ধরার জন্য বিদ্যা শিক্ষা লাগে। আবার শব্দসমূহের প্রকৃষ্ট বিন্যাসেও কেউ কেউ খুঁজে পেয়েছে কবিতার উত্তম সৌকর্য।

মহাকাব্য খটর মটর শব্দে ধাক্কাধাক্কি অমিত্রাক্ষরের গাড়ির গায়ে তেমন হাওয়া লগলো কি? কোথা হতে মন মাতানো রোমান্টিকের ঢেউ জাগে? ‘আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে’… কবির ‘সুরে সুরে সুর মেলাতে …’ রবীন্দ্রনাথের ভাষা কি আশায় মাতালো আবার? তথাকথিত বঙ্গীয় রেনেসাঁর শেষপাদে এসে ‘এ কোন আলো লাগলো – লাগলো চোখে’? তারই মধ্যে নতুনের কেতন উড়লো, ‘বিদ্রোহ আজ বিধোহ চারিদিকে’। ‘বড় কথা ভাব আসে নাকো’ বলে নজরুল কারা ঐ লৌহ কপাটে ঊষার দুয়ারে হানে আঘাত। তারও মাঝে মহা ভাস্বর মহাকালের গাঙ গেয়ে আন রবি। তবু কি থেমেছে কবি? বিশ্বকবির বিশ্বজয়ও কবিতার বাঁকবদল থামাতে পারে নি। নিরবে ঘাসের সঙ্গীত শুনে ঘাই হরিণীর মতো আসে নি কি কোমল কিন্তু সুস্থির পালা বদলের বাংলা  কবিতা?

‘উপমার কবিতা’ বলে তাই একদিন বাংলা কবিতার দিগ্বলয়ে ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে’ চেয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন। দোয়েলের ফড়িংয়ের বেমে ম্লান প্রকৃতির মতো কবি আসে ফিরে এই বাংলায়। তেমন দিনের প্রতীক্ষায় কবিতায় কতো কাল আজও কেটে যায়, অসহায় বিবমিষায়।

বেতের ফলের ঘ্রাণে নিভৃতে যাপিত কবি
ফিরিবে না এ সবুজ করুণ ডাঙায় জানি
দোয়েলের ডাক তবু কান পেতে শুনে যাই
বনলতা সুরঞ্জনা ব্যাকুলতা দেখায় কখনো যদি
বোধ বুঝি জন্ম নেয় ডাহুকের শ্যামাঙ্গীর দেশে
নিতান্ত ফিঙের দেহে ফিরে যদি রূপসী বংলার কবি
যতদিন মৃদু স্নিগ্ধ বায়ু বয় সবুজ ঘাসের গায়ে
স্রোত-সিক্ত ধাবমান ধানসিঁড়ি নদীটির জল
হয়তো হঠাৎ কবি মানুষেরই বেশে জন্ম নেবে
‘আবার এসেছি ফিরে’-বলে উঠবে লাজুক চিবুক।
(লাজুক চিবুক/ শাদা অন্ধকার)

‘রৌদ্র করোটি’তে ঢাকার রাজপথে যখন কবি শামসুর রহমান ‘বন্দী শিবির থেকে’ কোনো একদিন ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’য় স্বপ্নগ্রস্ত’ তখন ‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে, খোলা আয়েশা আক্তার’ বলে ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’য় নিমগ্ন ‘সোনালী কাবিন’ হাতে কবি আল মাহমুদ। আর দিকে দিকে ‘শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে’ কিরাতেরা উঠিয়েছে ফলা। আমরা কি দেখিনি কবিকে স্বপ্ন জগত থেকে নেমে এসে ‘আমি কবি যত কামারের’ বলে উচ্চকন্ঠে হতে?

প্রতিজন কবিরই থাকে নিজস্ব কবিতা ভাবনা-আপন কাব্যের চিন্তা। কারো ভাবনা গতানুগতি, কারো বা অনুকৃতি, আবার কারো চিন্তায় ঝলসে ওঠে নতুন দিনের স্বর-কাব্যস্বর, কাব্যভাষা। স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ বাংলা কাব্যের ভাষা ও বুননকে অনিবার্যভাবে নতুন ব্যঞ্জনা দেয়। তাই তো গর্ব ভরে বলতে পেরেছি ‘আমরা তামাটে জাতি আমরা এসেছি’। আর ‘আমরা পূর্বপুরুষের পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিলো’ আজ আমরা স্বাধীন। আর আমরা জেনেছি ‘যে সাহসী সে যুদ্ধ গেছে, যারা যুদ্ধে যায় তারা ফিরে আসে না, অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ এক রক্তস্নাত কিংবদন্তীর কথা বলে। আর আমরা ‘লক্ষ্মী বউটিকে আজ আর কোথাও দেখি না, শুধু রাজহাঁস দেখি’ কিংবা দেখি সখিনা বিবির ভাঙা কপাল। আর দেখি না হরিদাসীর সিঁথির সিঁদুর মুছে গেছে?

তারপরও আমাদের পাতে বাড়া ভাতে মাছ ওঠে, যুবতীয় ঘাড়ের কালো তিন আমাদের হৃদয়ে নতু শিহরণ জাগায় বৈকি! ভালোবাসায় যতই বেঁধেছি বুক ততবার ঘূর্ণি এসে করেছে তোলপাড়-কতো সুধাংশু ছেড়েছে স্বদেশ, নিবারণের ভিটায় চড়েছে ঘুঘু… তুব কবিতা হেঁটেছে পথ, কবিতা করে কলরব। ‘ভাত দে হারামজাদা’ বলেও মানচিত্র খেতে কবি কতোটা তৎপর? তুব আমরা কি চাইনি ‘আমাদের ঠান্ডা ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক’ ….. ? আমরা তবে সে কোন পরশপাথর খুঁজে ফিরি সারা দিনমান ?

সে কার চোখের জল লোহা হয়ে যায় আজ? দুঃশাসন ক্রমাগত টেনে যাচ্ছে
দেশমাতৃকার শাড়ি। কে আজ শুনবে তবে ধান ও জলের ধ্বনি, খুঁজে ফিরবে খ্যাপার মতন পরম পাথর?
দরবারে সকলেই ধৃতরাষ্ট্র অথবা গান্ধারী। নির্বাক অমাত্য মাঝে শকুনির কী
অদ্ভুত চোখের বিদ্রুপ। স্তব্ধতার অবসরে শুধুমাত্র দ্রেীপদীর স্বরঃ
‘‘কোথা কৃষ্ণ, রক্ষো আব্রু’’
বিংশতি শতকে বুঝি কৃষ্ণ বাড়ায় দয়ার্দ্র সাহায্যের হাত?
আমাদের কৃষ্ণ হোক দ্রেীপদীর আপন সন্তান, সকালে সন্ধ্যায় যারা মাটিকে নির্ভর করে। ধান ও জনের ধ্বনি যাদের হৃদয়ে তোলে দোতারার সুর। পরশ পাথর তাকে খুঁজতে দাও খ্যাপার মতন।
(আব্রু/ অন্য মন্ত্র)

কবিতা পথ হাঁটতে হাঁটতে পার করে নানান চড়াই উৎরাই। নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে যে কবি একদিন গেয়েছিলো ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী। হাড়ীত ভাত নাহি নিত আবেশী। বেঙ্গ সংসার বডহিল জাঅ। দুহিল দুধ কি বেন্টে সামায়’। সে অভাবের সংগ্রাম থেকে কবি কৃষ্ণের আরাধনা ও প্রেমলীলার কীর্তনে মগ্নচৈতন্যে মজ্জমান হয়ে পড়ে ভিন্ন দিনের ভিন্ন প্রতিবেশে। কবি কি সুদূর আরব্য কাহিনী ইউসুফ-জুলেখা কিংবা লাইলী-মজনুর প্রেমে বিভোর নন? দূর অতীতের শকুন্তলার প্রেম কালের সে কোন প্রবাহে রাধা-কৃষ্ণ কি ইউসুফ-জুলেখা বা লাইলী-মজনুর মোহে ঘুরপাক খায়। আলাওলের পদ্মাবতীই বা কোন বেদনায় ভাসে ?  কবিতার অন্তর্গত সুর এই প্রেম-পাত্র, সময় ও সমাজ বদলের সাথে সাথে বদলে যেতে থাকে। তাই কি প্রশ্ন আসে ‘তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ী থামে ? আর আজ কোমল রজনী পোহায়, তবু ‘মুঠোফোনের কাব্য’ বিলায় না কি প্রেমের নতুন ধারণা ?

প্রেম কি শেষতক মিলেছে ভুবনে ? অমিয় চক্রবর্ত্তী যতই বলুন না কেন ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’-মেলেনি রাধার সাথে কৃষ্ণ, জুলেখার সাথে ইউসুফ কিংবা লাইলীর সাথে মজনু। শুধু কি এশিয়াতে ? শেক্সপীয়রে কি প্রেমিক মিলেছে প্রেমিকার সাথে ? তাই দিন বদলের সাথে সাথে কবিতায় ক্ষোভ জন্ম নেয়, হতাশার করাল গ্রাস ছেয়ে ফেলে কবিতাকে। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীকে আর যেন চিনিতে পারে না কেউ। ‘পোড়ো জমি’ জুড়ে ‘বিবমিষা’ উগড়ে দিতে দিতে একদিন জন্ম নিলো আধুনিক কবিতা। নতুনের কেতন উড়িয়ে কাল বৈশাখীর ঝড় উথাল-পাথাল করে পৃথিবীকে। আর আমরা কি স্মরণ করতে পারিনি এরিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব ? আমরা কি জানিনি কমেডি অপেক্ষা ট্রাজেডিই শেষ পর্যন্ত নান্দনিকতার দাবিদার ?

আধুনিকতার মধ্য দিয়ে জন্ম নিলো রোমান্টিকতার এক নতুন জগৎ। এন্টি হিরোর পৃথিবী। আর তার মধ্যে ট্রাজেডি তৈরি করে নিলো তার আপন কক্ষ পথ। তাই তো রাবনের জন্যে মাইকেলের মন ভিজে ওঠে; বিভীষণকে আর ভালবাসতে পারি না, আমরা যারা কবিতার পাঠক। ‘এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে, কেমনে লক্ষ্মণ আসি … ’ আমরা বুঝতে চাই শকুনির বেদনা কোথায় ? আমরা খুঁজতে শিখি একলব্যের অঙুলি কর্তনের কারণ। অথবা-কর্ণ-কুন্তীর বেদনার লোনা জল কোন ঘাটে গড়িয়েছে ? আর তাই এ যুগের কবিতা উচ্চারণ করে ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না পাবে না’।
আর আমরা কি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি-কেবল নারীর জন্যই পৃথিবীর রং বদলে বদলে যায়, কালে কালে ঘটে মহা মহা যুদ্ধ ? ধ্বংস হয়েছে ট্রয়, কুরু বংশ, আরও কতো নাম না জানা জনপদ কেবল নারীর জন্য! নারীই নন্দন তবে ? নারীর ভূষণেই কবিতার নান্দনিকতা ? ‘সোনালী কাবিন’ পড়ে আমরা কি বুঝি না শ্রমিক সাম্যের প্রেরণাও নারীর কৌপিন থেকে আসে ? রবীন্দ্রনাথের নারী আবার সুদূরের পিয়াসী, সিন্ধুপারের ওপার থেকে মন ভুলিয়ে যায়। তবে নারী মানেই তো বহুবর্ণিল এক রহস্য কাহিনী। তাইতো সুরঞ্জনা কিছুতেই বনলতার মাপের নয়। কবি কি পক্ষপাত দেখাননি বনলতার প্রতি? অথবা আমরা-পাঠকেরা ? সুরঞ্জনা যুবকের কাছে গেলেও, প্রেমিক মিললেও প্রেমিকার সাথে-আমরা বাসনা রাখি সে-ই বনলতার, পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে যে জানতে চাইবে ‘এতদিন কোথায় ছিলেন ?’ এন্টি হিরোর ভীড়ে আমরা যতই মেঘনাদের জন্য অশ্র“পাত করি না কেন, মনে মনে সূচনা রাম-প্রীতিকে মনের কোণে প্রশয় দিতে চাই। তাই একবিংশ শতকের সূচনা ঘটবার আগেই শুরু হয়ে যায় ‘বিনির্মাণ’। নতুন করে কাব্যকন্ঠ তৈরির চেতনা। তারপরও ‘বিরহ বড় ভালো লাগে….’।
আজ বিশ্বযুুদ্ধ থেমে গেছে-স্নায়ুযুদ্ধ দুর্বল। আরমা দেখিনি কি সত্তুর বয়সী গাছও কী অদ্ভূত থুবড়ে পড়ে মুখ ? অর্থনীতির যুদ্ধে তো আমরা আগেই পরাস্ত, তৃতীয় বিশ্বের  অস্তিত্ব কেবলমাত্র প্রথম বিশ্বের করুনাকে পুঁজি করে। বাড়ন্ত হাঁড়ির বার্তা জানতো কেবল বর্ষিয়ান চাষা। তবুও ভোরে সোনালী সূর্য ওঠে পূর্বাকাশে। এখনো প্রতিদিন কিশোরীরা যৌবন লাভ করে, এখনো শীতের শিশিরে শিউলির ঝরে পড়া আমাদের কবিতা লিখিয়ে ছাড়ে। এখনো প্রেমিকা ত্রস্ত ছুটেছে স্বপ্নবিলাসী প্রেমিকের কাছে।

প্রেমিক মিলেছে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি মেলেনিতো কোনো ঘাটে
বৈরুত থেকে গাজা প্রান্তরে ছোটে ইয়াসির আর আরাফাতদের সংসার
হোলি উৎসবে বেজায় মেতেছে ইস্রিলি বোমারুরা-শিশু আজগর ছিন্ন করোটি
ধুলোবালি আর ভগ্নস্তূপে ফাতেমার পোড়া লাশ, শকুনেরও ছুঁতে ভয় …..
গাঢ় কনভয়, মিলিটারি ট্রুপ কোথাও বা এরিকের চোখ লাল, বারুদ সুবাসে
নদীজল নয় লোহুর প্লাবনে দজলা ফোরাত ভাসে-মৃত্যু আভাসে
কিলবিল করে আবাবিল নয় বিমানের বোমা মাথর ওপরে মরুতে-মারীতে
আয়েশার চোখ ঢেকে রাখা শোক-লাশ খোঁজে বাড়ি বাড়ি, পাথরের ঝোপে
ভোরের আজানে শিশিরের রোদে শিশু হাসানের হাসির আগ্নেয়াস্ত্র …
মোসলেম বুঝি এখনো চিবুকে ভালোবাসা পুষে রাখে, হাতের গ্রেনেডে প্রেম!
(হোলি উৎসব / শাদা অন্ধকার)

প্রেমিক মিললেও প্রেমিকার সাথে শান্তি মেলেনি কোনো ঘাটে, বৈরুত থেকে গাজা প্রান্তরে ইয়াসির আর আরাফাতদের সংসার ছুটেই বেড়াচ্ছে কালে কালান্তরে। ইরাক, আফগান কী ফিলিস্তিনে বারুদের হোলি উৎসবের এই গাঢ় বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়েও ‘মোসলেম বুঝি এখনো চিবুকে ভালোবাসা পুষে রাখে, হাতের গ্রেনেডে প্রেম!’
প্রেম অযাচিত ভাবে আসে, প্রেম মলিন মুখেও হাসে-আর, শুধু ভালোবাসে। পেনিলোপির পাণিপ্রার্থীর দশ বছরেও ভাঙ্গাতে পারেনি নকশী কাঁথার ধ্যান, সাবিত্রী পৌঁছেছিলো যমরাজ দরবারে, বেহুলা ভাসালো ভেলা নখিন্দরের প্রেমে।

বৈশাখী ঝড় তুমি কুমারীর দুরু-বক্ষে নাচো
জানাবো নির্ভয়ে তাকে ভালোবাসা চর্চা করা চাই,
ট্রয় ধ্বংস করবে, প্রেম আজ অতো শক্তিমান নয়
আশার পিদ্দিম আজ প্রশ্রয়ের আলো ছাড়া কিছুতেই জ্বলতে জানে না।
(মেঘদূত কথা / শাদা অন্ধকার)

ট্রয় ধ্বংস করবে, প্রেম আজ অতো শক্তিমান নয়। তারপরও যুদ্ধ তো নারীর কারণেই ঘটছে, নারীকে নিরাপদ রাখাই তবু যোদ্ধার আরাধনা। ট্রয়ের হেলেন থেকে রামের সীতা, যুদ্ধে মেতেছে বুঝি সাহসী চিতা, মাঠ থেকে বন উজাড় হয়েছে, কাল থেকে মহাকাল। তারই মাঝে আছে চির উজ্জ্বল কবিতার চরণেরা, ক্ষত বিক্ষত পঙ্ক্তিতে কাঁদে কবিতা-পাগল হৃদয় আত্মহারা।
রোমান্টিক চেতনার পাদদেশে এসে কবিতায় ভাসে চেতনার অবক্ষয়। এখন সকলই বাজার। বাজার আমাদের অন্ধ করেছে। এই শাদা অন্ধাকারে আজ আর আমরা কিছুই দেখি না। আমরা দেখি না রাতে, কতো দ্রৌপদীর লজ্জার বাজার দূর কমে গেছে-শেয়ার মার্কেটে ধস্-শিশুর খাবার থেকে বাতিল দুধের নাম-কূপি আর জ্বলবে না সলিমুল্লা মুদির দোকানে। আমাদের সমস্ত অস্তিত্বে যেন আতঙ্খের লাল কবুতর।

তারপরও এই অবক্ষয়ের সোপানের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নতুন কাব্যভাসা জন্ম নেয় বৈকি! জীবনের কোনো পদরেখা নেই এই শ্যামলিম দেশে, রয়েছে ময়ুর পুচ্ছের কাক, সোডিয়ামে রাঙা সুখ! কবিতা এখানে সাড়ম্বরিত স্বৈরিক সমাবেশে; যদিও ষড়সন্তান মৃত্যুকবলে, এ বেলা হবে না নাওয়া, তবুও কবিরা স্ব-গভীরে সারে কবিতার মোট বওয়া। উত্তর আধুনিকতার উত্তাপ মেখে ভালোবাসা ওড়ে উত্তর মেঘে, বেদনার পূর্বরাগ আবার এসেছে ফিরে হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেমে ধানসিঁড়ি নদীটিতে ভেসে।

চমকে চমকে উঠি আজানের ভোরে, দোয়েল তখনো মগ্ন নিস্তরঙ্গ ঘুমে
শিউলি তলার ফুলে শিশিরে লাগেনি রোদ, শিশু অদিতার হাত খুঁজে ফিরে তোমার নরম বুক
ঝাঁক ঝাঁক শাদা শাপলা জলাধারে ধানের সোনালী ঘিরে….
অবিন্যস্ত বিস্তৃত জলাতে-কচুরিপানার দেশে শাপলার পবিত্র শাদা
কোথাও বকের ধ্যান-তপস্যা একপায়ে….
(এখানে অনেক জল / শাদা অন্ধকার)

এইভাবে বদলে গেছে সহস্র কবিতার ভাষা, রূপ, উপমা। আমরা যারা কবিতার সুশান্ত পাঠক, আমাদেরও পাঠ বদলে যায়, বোধ পাল্টে যায়। শাদা অন্ধকারে মাঝে মধ্যে আমাদের ক্ষোভ জন্ম নেয়, আমরা ঠেলেছি লগি উজানের পথে, আবার ভাটির টানে ফিরে আসি সে-ই পুরনো আঁধারে-‘সম্মুখের আমারে টানিছে পশ্চাতের আমি’। অ্যালিসের আজব জগতে আমরা দৌঁড়ায় শুধু আগের জায়গায় দিকে যেখানে হাজার বছরের বাস! আর আমরা কবিতা পড়েছি, আমরা কবিতা লিখেছি হাজার বছর ধরে; কিংবা অযুত জীবন ভরে আমরা কবিতার ধূসর জগতে …

কবিতা কখনো সামষ্টিক চিন্তার প্রবল আধার হয়ে ওঠে, আবার যে পরক্ষণেই কবিতা একান্ত আপনার, নিজস্ব বোধের শব্দ-শব্দ খেলা। কবিতা তবে কি ভাবনা-চিন্তার সুন্দরতম প্রকাশ ? যে প্রশান্ত সংস্কৃতিতে আমার বেড়ে ওঠা, যে তীব আকাঙ্খা আমার সমাজের, যে শুভ্র স্বপ্ন আমার হৃদয়ের-সেই অনন্ত সৌন্দর্যের রূপায়নের প্রচেষ্টাই কি আমার কবিতা ? আমার , আমার প্রেম, আমার জীবন, আমার স্বপ্ন, সব-সবকিছুই একসাথে একাকার!

আমার কবিতা এক সৌম্য সভ্যতার প্রাজ্ঞ সংস্কৃতির উত্তরাধিকার; আবার কখনো কখনো কোনো নারী, ‘স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের তুমি’। আমি কখনো তীব্র আবেগে ভাসতে ভালোবাসি, আবার কখনো ছন্দ-শব্দ-রূপক ইত্যাদির উচ্ছ্বাসে সংযমে হাসতে ভালোবাসি। কবিতা যেন সারাটা জীবনই মধূভাষিণী-বহুরূপী হয়ে থাকে! আমার কবিতা সারাদিনমান ভালোবাসাটাকে ডাকে ? আমার অভিজ্ঞতা আর বহমান স্বপ্ন ধরে রাখবার চিরন্তন সাধনাই কি তবে চির চলমান কবিতা ?

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E