৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২১২০১৬
 
 ২১/১০/২০১৬  Posted by

আঁধারতমা আলোক ও তামাশাপ্রবাহ
– গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি মাসুদ খান

কবি মাসুদ খান

মাসুদ খানের ‘আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি’ কাব্যটির নাম স্বব্যাখ্যাত বলে মনে হতে পারে। কৃষ্ণাঙ্গী, প্রজ্ঞাবতী দয়িতার উদ্দেশ্যে কবি হয়তো গোপন কথা তুলে ধরেছেন, হয়তো আবিষ্কৃত হবে শেক্সপিয়ারীয় সনেটের কোনো ডার্ক লেডি – ‘a woman coloured ill’ যার অবয়বের অন্তরালে রয়েছে রহস্যআঁধার – পাঠককে এরূপ চিন্তা অধিকার করতেই পারে। কাব্যটির নাম উঠে এসেছে ‘সেতু’ নামের একটি কবিতা থেকে – কবিতাটির প্রথম স্তবক দেখে নেয়া যাক – ‘কোন-বা জাতির জাতক তুমি/ কোন-বা প্রাণের প্রাণী!/ আঁধারতমা আলোকরূপেই/ তোমায় আমি জানি!’ কোনো স্ত্রীমূর্তি ‘আঁধারতমা’-কে কবি আলোকরূপেই অবলোকন করেছেন। কবিতাটি পাঠককে বিমূঢ়, বিভ্রান্ত করে ফেলে যখন কবি ‘আঁধারতমা’র লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে স্বয়ং সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠেন- ‘ভাব-উচাটন পুরুষ হলে/প্রকৃতিস্থ হও।/কিংবা যদি হও প্রকৃতি,/পুরুষরত রও।’ রহস্যঘনতার জন্য কবিতাটি পাঠ করে আনন্দ পাওয়া যেতে পারে; অর্থ উদ্ধারে প্রয়াসী হলে গলদ্গর্ম হতে হয়। কবিতাটি এ কাব্যের সবচেয়ে দুর্বোধ্য কবিতা। এটি ধাঁধাগোত্রীয় এবং প্রায় অব্যাখ্যেয়। নানা রূপে পরিভ্রমণশীল, রহস্যময় এ আলোকসত্তা জীবনের গূঢ়ার্থকে প্রকাশ করে। এর সাথে যোগাযোগের সেতু নির্মাণের উপায় নিয়ে কবি প্রশ্নমুখর। এ আলোকসত্তার জলজ, অণুঘটক বা লৈঙ্গিক রূপ নিয়ে সংশয় থাকলেও বিচিত্র রূপ-পরিগ্রহণ-দক্ষতা নিয়ে অস্পষ্টতা নেই। হয়তো কবি জানাতে চান জীবনের কোনো স্থায়ী গূঢ়ার্থ নেই, কালে কালে তা পরিবর্তনশীল। এর সাথে যুক্ত হবার সেতু নির্মাণের জন্য কবি অভীপ্সু। ‘আঁধারতমা’ আলোকসত্তার মতো ‘সেতু’-ও একটি প্রতীক হিসেবে কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে যা সম্ভবত প্রজ্ঞাকে উন্মোচন করে। কবি একটি সত্তার পরিচয় দেয়ার ক্ষেত্রে ঋজু ভাষ্য উপস্থাপন করেন না। বোধগম্যতার গণ্ডির বাইরে সত্তার বৈশিষ্ট্যকে প্রলম্বিত করেন। উদাহরণস্বরূপ ‘শৈবালিনী’ কবিতার কিছু পঙ্ক্তি আমরা বিবেচনায় রাখতে পারি – ‘তুমি মাছ হয়ে যাবে, নাকি/ হবে কোনো জলজ উদ্ভিদ -/ এতকাল পর এই দ্বিধা আজ, শৈবালিনী, জাগছে তোমাতে/ মুহুর্মুহু বিজলিবিলাসে।’

‘আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি’ কাব্যের অনেক কবিতায় মাসুদ খানের গভীর দর্শন স্ফুরিত হয়েছে। ‘প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল’ কবিতায় ঘাসখেকো একটি ব্যাঘ্রশিশুর চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে। যদিও সে ঘাস খায় ‘ক্ষাত্রতেজ অব্যাহত … ঠাস-ঠাস করে থাপড়ায়, দাবড়ায় বড়-বড় নিরীহ ভেড়াদের।’ কবি এখানে জানাতে চান যে, মানুষ বা প্রাণীর অন্তর্নিহিত প্রকৃতি রূপান্তরিত হয় না। ‘প্রতিমা’ কবিতায় স্পষ্ট হয়, রূপারোপ করা দুঃসাধ্য কর্ম। কবি ঘোষণা করতে চান, রূপের সর্বজনগ্রাহ্য আদর্শ নেই। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিমার গভীরতর প্রদেশ থেকে উঠে আসে রূপ, রূপের প্রতিম।’ ‘রূপান্তর’ কবিতায় বর্ণিত হয়েছে, মানুষ বনবিড়ালের ‘অতিবৈড়ালিক’ হাসি নিয়ে হাটে-ঘাটে, নগরে-বন্দরে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ছদ্মমুখ ধারণে পারঙ্গম কপট প্রাণী – এ বোধকে কবি বাঙ্ময় করে তুলেছেন এ কবিতায়। ‘জঙ্গল একটি অনবদ্য কবিতা; প্রথম চারটি পঙ্ক্তি তুলে ধরা যাক –

এই এক বিভোর জঙ্গল যেখানে বাঘকে জাগতে হয়
সূর্য-জাগারও আগে, আর ঊষা থেকে প্রদোষ অবধি,
ধেয়ে যেতে হয় অবিরাম হরিণের ঘ্রাণে।
আবার হরিণকে ছুটতে হয় বাঘদেরও আগে।

কবি এখানে জানাতে চান, পৃথিবী প্রকৃতপক্ষে ‘এক অবারিত দৌড়ক্ষেত্র, এক অবাধ ধাবনায়তন’ – মনুষ্য জীবন ধাবনখেলার নামান্তর। ‘প্রেম’ একটি অনায়ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। হৃদয়-স্পন্দন ও কোলাহলের শীর্ষে নৈঃশব্দ্য অবস্থিত, আঙ্কিক জীবনের অবসান ঘটলে গভীর সঙ্গীত উত্থিত হয় – এ বিশ্বাসকে কবি শিল্পময় করে তুলেছেন কবিতাটিতে। কবির ভাষায় ‘সমস্ত শব্দের মৃত্যু হলে পর শুরু হয় নৈঃশব্দ্যের বাদশাহি’। ‘নিরুদ্দেশপর্ব’ টানা গদ্যে লিখিত একটি কল্পনা-বৈভব-ঋদ্ধ কবিতা। এ কবিতায় মহাস্পেস থেকে কবি পৃথিবীকে অবলোকন করেছেন। মহাস্পেসের এক বনাঞ্চলে কবি নিজেকে আবিষ্কার করেন যেখানে ইস্পাতপ্রভ বৃক্ষের ‘শাখা-প্রশাখার চূড়ায় চূড়ায় গুচ্ছ গুচ্ছ রামধনুর বিচ্ছুরণ’ ; স্বর্ণলতার ‘মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়েছে আলোকরশ্মি’; চারদিকে ‘ইস্পাতরং আর অ্যালুমিনিয়ামরং আর হালকা সোনারঙের চূড়ান্ত মসৃণতা’। ‘অবেলায় পাওয়া গান’ কবিতায় মানুষের দুর্বোধ্য চরিত্রের জন্য পৃথিবী সুখকর হয়ে ওঠে নি। ‘সুগন্ধকাহিনি’ কবিতায় ‘প্রচুর বিয়োগচিহ্ন, ঢ্যারাচিহ্ন, আর দুষ্টগন্ধে ভরা জগৎসংসার’-কে নিয়ে কবি বেদনাহত হয়ে উঠেছেন। ‘নিরুদ্দেশপর্ব’-এ যে জগতের সন্ধান তিনি লাভ করেছেন তা আলোকোজ্জ্বল – সেখানে ‘অসুখবিসুখ আর হয় না বললেই চলে’। কবি এ উপলব্ধি প্রচার করতে চান যে, পৃথিবী কাঙ্ক্ষিত আলোকের উৎস নয় – সত্যের দীপশিখা কোনো কালেই সেখানে হয় নি প্রজ্বলিত। দীর্ঘ কবিতাটির শেষে কবি উচ্চারণ করেন,

‘দূর থেকে পৃথিবীকে আজ একপিণ্ড মিথ্যার মতো মনে হলো’।

মাসুদ খানের কবিতায় বিশেষণের প্রতাপ লক্ষণীয়। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে রচিত জেরাড ম্যানলি হপকিন্সের কবিতা ‘’Pied Beauty’’-র শেষ স্তবক বিশেষণ আকীর্ণ –

All things counter, original, spare, strange;
Whenever is fickle freckled (who knows how?)
With swift, slow; sweet, sour; adazzle, dim;
He fathers-fourth whose beauty is past change:
Praise him.

হপকিন্সের মতো মাসুদ খান তাঁর কবিতার অনেক পঙ্ক্তি কেবল বিশেষণ দিয়ে সজ্জিত করেন। কাব্যের প্রথম কবিতা ‘বীতকৃত্য’-এর ষোড়শ লাইনে ‘সেদিন কোথায় কোন দূরে নিয়ে যাবে গো আমায়’ উচ্চারণ করবার পরেই কবি কবিতার সমাপ্তি টানেন বিশেষণ সহযোগে – ‘ধর্মহারা বীতকৃত্য সূত্রহীন পুরীষবিহীন…। ‘নলজাতক’ কবিতায় নলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য কবি আহ্বান জানান ‘সারা গায়ে নালঝোলমাখা কালো-ধলো সরল ও কোঁকড়া-চুলো গমরঙা তামাটে কপিশ অগণিত রৌদ্রদিগম্বর ন্যাংটা নলজাতক’-কে। ‘রূপকথা’ কবিতায় জগতের ধুরন্ধর নকশাকে উপেক্ষা করে কিছু সিংহ স্বাধীন থাকে। এদের সম্পর্কে কবিতার শেষ পঙ্ক্তি নির্মিত হয় শুধু বিশেষণ দিয়ে – ‘অজেয়, অবশ্য, অনপনেয়, বহতা, বহমান…।’ মাসুদ খান কোনো সত্তা বা বস্তুর চারিত্র উপস্থাপনে অতিরিক্ত বিশেষণ ব্যবহার করেন। বিশেষণ-বহুলতা শিল্পসত্তার অঙ্গ-বিন্যাসের জন্য জরুরি নয় বরং শব্দশিল্পের নিটোল স্ফুরণের জন্য অন্তরায়। বিশেষণের প্রাচুর্য ব্যতীত অনেক মানোত্তীর্ণ কবিতা লিখিত ও প্রকাশিত হচ্ছে। কবি তুহিন দাসের ‘দূরের পাড়া কাছের বাড়ি’ (২০১৫) কাব্যের দ্বিতীয় কবিতার দিকে দৃক্পাত করা যাক –

বিকেল বারান্দা থেকে রাস্তার দিকে
তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে,
ঐ যে দূরের মানুষগুলো, তাদের ইচ্ছেগুলো
থেমে পড়াগুলো ছুঁতে ইচ্ছে করে

এবার আমিও রাস্তায় যাচ্ছি;
অন্য কোনো বিকেলবারান্দা থেকে
আমাকেও দূরের ভেবে ভুল করবে কেউ,
অথচ আমি এ পাড়ারই লোক ছিলাম।

কবিতাটিতে বিশেষণের বাড়াবাড়ি নেই। কবিতাটি নির্মেধ – কবির প্রসারিত অন্তর্লোক ও গ্রহণক্ষমতার স্বরূপ উন্মোচনে শিল্পকর্মটি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয় নি।
অতিরিক্ত বিশেষণ ব্যবহারের পাশাপাশি মাসুদ খান ক্যাটালগিং কৌশলকে অবলীলাক্রমে কবিতায় প্রয়োগ করেছেন। বাইবেলে বংশতালিকার বর্ণনায়, ইলিয়াড, মহাভারত প্রভৃতি মহাকাব্যের অনেক দীর্ঘ বিবৃতির ক্ষেত্রে ক্যাটালগিং কৌশল আদৃত হয়েছে। হপকিন্সের ‘Pied Beauty’ কবিতার দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ পঙ্ক্তিতে ক্যাটালগিং এর দৃষ্টান্ত বিধৃত। পঙ্ক্তিগুলোতে আকাশ, ট্রাউট মাছ, চেসনাট, ফিন্চ পাখি, ভূদৃশ্য প্রভৃতির বর্ণময় চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘Song of Myself’ এর পঞ্চদশতম অংশে ক্যাটালগিং এর ব্যবহার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এ অংশে কবি কনট্রালটো, সূত্রধর, বিবাহিত ও অবিবাহিত শিশু, পাইলট, হাঁস-শিকারি, উপপুরোহিত, সুতো প্রস্তুতকারিণী, কৃষক, উন্মাদ, সাধারণ মুদ্রাকর, ক্রীতদাসী (quadroon girl) প্রভৃতি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বর্ণনা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বসত্তার বিচিত্র প্রকাশ হিসেবে স্বীকার করে তাঁদের সাথে আপন সত্তাকে তিনি একীভূত করেছেন। একটি অন্তর্গত সেতু নির্মাণ করে কবি তাঁর প্রাতিস্বিক বোধকে কসমিক বোধের সাথে যুক্ত করেছেন –

The city sleeps and the country sleeps,
The living sleep for their time, the dead sleep for their time,
The old husband sleeps by his wife and the young husband sleeps
by his wife;
And these tend inward to me, and I tend outward to them,
And such as it is to be of these more or less I am,
And of these one and all I weave the song of myself.

ক্যাটালগিং নতুন কোনো কাব্য-কৌশল নয়। কবিতার সংহতির এ যুগে মাসুদ খান নির্দ্বিধায় ক্যাটালগিং এর দাক্ষিণ্য গ্রহণ করেছেন। তাঁর ক্যাটালগিং এর কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ।

১। আর যত শীল ও দুঃশীল গতি অগতি কুশল অকুশল
আর যত অভিজ্ঞা ও সমাপত্তি, বারো রকমের বন্ধনযাতনা
সংসার সন্ন্যাস মোক্ষ মোহ কাম কৃত্য ঘাম মূত্র বীর্য ধর্মাধর্ম পুরীষ পৌরুষ
সব একাকার হবে…(বীতকৃত্য)

২। কোনো প্রেত-প্রেতিনী, অথবা কোনো যম-যমী, জিন-পরি, ভগবান-ভগবতী,
ফেরেশতা-ইবলিশ কাঁহা কিচ্ছু নাই, কেউই ঘেঁষে না কাছে, যে,
তার সঙ্গে একটু কথা বলবে, কফি খাবে (নিঃসঙ্গ)

৩। শিকার মিলেছে প্রচুর।
শিয়াল, শজারু, শকুন, গোধিকা, গন্ধগোকুল, ফেজান্ট, কাছিম…। মেলেনি কেবল
কাক আর বক; ওদেরকে তো আগেই ভস্ম করে দিয়েছে তপস্বী। (প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল)

৪। নিচে অরণ্য সমাজ। নিচে শকুনি গৃধিনী, অহি ও নকুল, নিপদ দ্বিপদ
শ্বাপদ ও চতুষ্পদ, সাপ ও গোসাপ, গন্ধগোকুল-কুল। তারা দৃষ্টিতে শ্যেন, চাতুর্যে
শৃগাল, বৃদ্ধিতে বায়স। (আবাহনের, নাকি বিসর্জনের?)

৫। এই অঙ্গিরা থেকে অগস্ত্য থেকে পুলহ থেকে ক্রতু থেকে নীল নীহারিকা
ওই কেতুপুচ্ছ, শুকতারা, অরুন্ধতী, আর মঘা থেকে মঙ্গল থেকে বুধ থেকে পুষ্যা
থেকে অশ্লেষা – (নকশিকাঁথা)

ক্যাটালগিং একান্তই বর্ণনাত্মক। কল্পনার অনন্য প্রভায় ক্যাটালগিং সংশ্লেষিত হতে পারে না বলে চিত্তগ্রাহী রূপকল্প নির্মিত হয় না। ক্যাটালগিং এর প্রসাদগুণে কবিতা প্রলম্বিত হয় কিন্তু বিভূতিমণ্ডিত হয় না।

মাসুদ খান বলেন- “কবি যা সৃষ্টি করেন তাকে বলা হয় ‘বিকল্প জগৎ’, ‘বিকল্প প্রকৃতি’ যেখানে খেলা করে অন্য আলো-ছায়া, অন্য মেঘ-রোদ্দুর, অন্য নিসর্গ – ভিন্ন চালে, ভিন্ন লজিকে”। মাসুদ খানের যুক্তির ভেতর স্বাভাবিকভাবেই মেটাফরের প্রাধান্য বিস্তৃত। ‘গর্ভগৃহপর্ব’ কবিতায় তিনি জন্মগ্রহণ বিষয়ক সিদ্ধান্তের রূপকাশ্রিত বর্ণনা দিয়েছেন। গোলকধাঁধাময় গর্ভভবনের দেওয়ালচিত্র এঁকে তিনি এক অদৃষ্টপূর্ব জগৎ উপস্থাপন করেছেন। গর্ভভবনের অগ্নিবর্ণ চিত্ররাজিকে তিনি জটিল মেটাফরের ভেতর দিয়ে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন- ‘এবং মাঝে মাঝে এখানে সেখানে কেন-জানি-না কেবলই লাল মোরগের চিত্র। ইতস্তত বেদী, আগুন আর লাল মোরগের প্রাধান্য। কিন্তু ভিন্ন-ভিন্ন চিত্রে। ঘুরে ঘুরে দেখি। দেখতে দেখতে একবার অভিলাষ হলো – বেদী, আগুন আর লাল মোরগকে একইসঙ্গে একই চিত্রে দেখবার। উদগ্রীব হয়ে ছবি দেখে বেড়াই। একদিন সেই বহু-আকাঙ্ক্ষিত চিত্রখণ্ড অবশেষে। বেদী, আগুন, আর লাল মোরগের অভূতপূর্ব সম্মিলন। এবার বেদীতে লাল মোরগ। পেছনের পটভূমি বহ্নিমান। মোরগের পালক আর পুচ্ছ লাল। মোরগের শীর্ষ লাল। মোরগের কণ্ঠনালী কিছুটা ছেঁড়া – সেই একই লাল রক্ত ঊর্ধ্বমুখে বিচ্ছুরিত, প্রায় আলোকের বেগে। পেছনের পটভূমিতে মরীচিকার মতো তরঙ্গরশ্মি, আগুনের। আগুনের হল্কাচূড়াগুলিও ঢেউখেলানো আর লাল – তবে একটু ভিন্নতর।’ মাসুদ খানের টানা গদ্যে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে গুণগত মানের বৈভিন্ন্য লক্ষণীয়। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রকল্পের পাশাপাশি ‘নাট্যশালা তামাশাপ্রবাহ’ কবিতায় প্রায় Automatic writing পর্যায়ের ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু পঙ্ক্তি তুলে আনা যাক – “আর ওই যে প্রেমিক-প্রেমিকা-যুগল, ওদের প্রণয় কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না সমাজ। সমাজ বড় কড়া। তাই ওরা এক মরণে দুইজন মরবার পরিকল্পনা করছে। ওদের নিয়েই তো গান বেজে চলেছে যুগ-যুগ ধরে – ‘এক মরণে দুইজন মরে/এমন মরা মরে কয়জনে//’। মরার পরে তাদের লাশ নাকি কেউ সৎকার করবে না, নদীতে ভাসিয়ে দেবে। দিক। নদী তো সর্বগ্রাহী, সর্বংসহা, সর্বসাক্ষী। তবে পানিতেও ওরা ভাসতে থাকবে, ভেসে চলবে যুগ-যুগান্তর। প্রেমের প্লবতাশক্তি খুব তীব্র। ফের বেজে উঠবে গান, ঢেউ তুলে আকাশে-বাতাসে – প্রেমের মরা জলে ডোবে না…/ ও প্রেম করতে একদিন, ভাঙতে দুইদিন, এমন প্রেম আর কইরো না দরদী//” ‘নাট্যমালা, তামাশাপ্রবাহ’ যে ভাষা ও রূপকল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে তা এ কাব্যের অপরাপর কবিতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়।

পাঠক হিসেবে মাসুদীয় লজিক কিংবা মেটাফর নিয়ে আমাদের কোনো জিজ্ঞাসা নেই। আমাদের রয়েছে প্রত্যাশা – মাসুদ খানের কাব্য-কৌশল প্রোন্নত হোক – অনায়াসে সনাক্ত করা যাক তাঁর চেতনা-অভিজ্ঞান।
১৬.০৯.২০১৬, ঢাকা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E