৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ২৩২০১৭
 
 ২৩/০৫/২০১৭  Posted by

অতনু ভট্টাচার্য-এর ছোট কবিতা

বৌদ্ধ দোহা, জেন কবিতা, চৈনিক কবিতা, রবীন্দ্রনাথ, অমিয় চক্রবর্তী (দু-বাংলার আরো উজ্জ্বল উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে)  এজরা পাউন্ড এরকম অনেকের কথাই চলে আসবে ছোট কবিতা নিয়ে কথা বলতে হলে। কিন্ত অত কথায় না গিয়ে আপাতত দেখা যাক “ছোট কবিতা” কে।

স্থুল অর্থে দেখলে মনে হতে পারে ‘ছোট কবিতা’ যত বড় ভাব বহন করুক না কেন দৃশ্যত:  তার আকার হবে কৃশ। অথচ স্থূল ভাব থেকেই সূক্ষ্ম ভাবে যাত্রা। যাই হোক, ‘বিন্দুতে সিন্ধু যোগ’ এই হল ছোট কবিতার মর্মের কথা। প্রশ্ন উঠতে পারে ঠিক কতটা ছোট হলে তাকে আমরা ছোট কবিতা বলবো (?)। আমি এই প্রশ্নের কোন নৈর্ব্যক্তিক বা ডিজিটাল কোনো উত্তর দিতে অক্ষম। ছোট কবিতার সংকলকরাও (যতটুকু দেখেছি) এ বিষয়ে স্থির কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো মোটেই সহজ নয় ধরে নিয়েই খোঁজ জারি থাক। তাই এই অবতারণা।

লিখতে লিখতে বুঝেছি একটি কবিতা যেন আগে থেকেই নির্ধারিত, তার আকার ঠিক কীরকম হবে। কবিতাটির হয়ে ওঠার মুহূর্ত অবধিই তার যাত্রা। ‘ছোট কবিতা’ কবিতা হয়ে ওঠার সেই মুহূর্তটিকেই ঘন করে তুলে তার ভেতরেই লীন হয়ে যায়। অতলস্পর্শী সেই চোরা ডাক।

স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল
        ক্ষণকালের ছন্দ
উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল
        সেই তারি আনন্দ।। ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

কখনও এমন হয়েছে যে একটি কবিতাকে ছেঁটে কেটে ছোট করা হল। ছোট করাতেই তার কবিতায় উত্তরণ হল। অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় যা বাদ যাওয়ায় একটি কবিতার জন্ম হল। শুরু থেকেই ছোট ও বড় কবিতা লেখার ফলে বুঝতে পেরেছি একটি কবিতা যে প্রেরণা তাড়িত হয়ে আসে, তাতে পরতে পরতে যেন পূর্ব নির্ধারিতই থাকে নির্মিত কবিতাটির অবয়ব বা পরিসর ।

মেধামনন এবং আবেগ একে অপরের হাত ধরাধরি করেই চলে। এই সংহত সহাবস্থানেই হতে পারে প্রকৃত কবিতার জন্ম। প্রকৃত কবিতা সে ছোট বা বড় যাই হোক, তা লেখা সহজ নয়। স্মৃতি, কল্পনা,স্বপ্ন কবিতায় কিভাবে অবধারিত ভাবে এসে পড়বে বলা যায় না। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ কিভাবে ছুঁয়ে যাবে কবিতাকে, স্বয়ং কবিও তা জানেন না। ‘ছোট কবিতা’ যেন ব্লেকের সেই কথা— ‘বিশ্বকে ধরা একটি বালির কুঁচিতে… অসীমকে ধরা আপন হাতের মুঠিতে’ । ফলে একটি ‘ছোট কবিতা’ লিখে উঠতেও কিন্তু দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। আবার পাঠকও সেই কবিতাটিকে চেতন বা অবচেতনে ধরে রাখতে পারেন আমৃত্যু ।

প্রতিবেশীর স্পর্শস্বর

ধ্রুব

উত্তর আকাশে ধ্রুব জ্বলজ্বল করছে
ধুর্‌ ওসব তো বইয়ে লেখা থাকে
বুঝিস না জিভ লকলক করে ধ্রুবর
চল ওকে ডেকে আইসক্রিম কিনে খাই

সপ্তর্ষি

বৈশাখে উত্তর আকাশে সম্পাদকমণ্ডলী
গম্ভীর আলোচনায় মগ্ন
যাকে সপ্তর্ষিমণ্ডল জানি
একদিন বাদরলাঠিফুলের থোকায়
চোখ রেখে এমন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল
ধ্রুব মুচকি মুচকি হাসছিল

অভিজিৎ

জৈষ্ঠ্য মাসে যা হয় কাঁঠাল এমন পেকেছে
আকাশের উত্তর-পূর্ব অবধি গন্ধ
অভিজিৎ সেখানে ছিলো একা আনমনে
এখন পাগল-পাগল অবস্থা
শুধুই নাক টেনে চলেছে

আষাঢ়

সোঁদা মাটির গন্ধ আর রথের পাঁপড়
উত্তর আর পূর্ব আষাঢের  মনের কথা
আরও কথা আছে
মেঘের আড়ালে অনেক কথা
ঝলকে একটু বেড়িয়ে এল
যেমন – কদমকুঁড়ি হাস্নুহেনা
অ্যাসিডবৃষ্টি…

কালপুরুষ

পুব দিকে রোহিণী আর আর্দ্রাকে সঙ্গে নিয়ে
ওই কালপুরুষ
যার ছায়া পড়লে ছেলেরা অপু অর্থাৎ বিবাগী হয়
অথচ এই পরাক্রমশালীর চোখের একফোঁটা
নেমে এলো হলুদ পাতাটির বুকে
তার বা সাধ্য কি ধরে রাখে
বুকে নিয়ে সেও ঝরে পড়ল
মাটির গভীরে গোপনে পোঁতা আছে
কালপুরুষের কান্না

মঘা

সিংহ রাশির বলে মঘার নাক উঁচু
ওই উঁচু নাকের জোর নিঃশ্বাসে
চারদিক কুয়াশা কুয়াশা
মাথা কামানো গাছগুলো
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে
মঘার ঘাম টুপটাপ ঝরে পড়ে
মাঠে মাঠে ঘাসে…

স্বাতী

উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে অনেক নিচে
তখন সপ্তর্ষিমন্ডল
পূর্ব কোণে বসে বসে স্বাতী গল্প উপন্যাস লিখছে
একবার নাকি ডায়ালগধর্মী উপন্যাস লিখে
ওই গোমড়াগুমোট সম্পাদকদেরও
বাধ্য করেছিল

শ্রবণা

শুধু মাঝ আকাশ নয়
শ্রবণা মাঝমাঠও ভালোবাসে
মেঘের ব্যালকনি থেকে দেখে
মাঝমাঠ চিরে এগোচ্ছে
কখনো নিখুঁত থ্রু
যে যাই বলুক শুধু শ্রবণার মন জানে
কেনো সে কিছুতেই তাকে রাখী পড়াতে পারবে না

শতভিষা

পূব আকাশ থেকে সে দেখে
যে সব তরুণ একদিন এই নামের কবিতার কাগজ
নিয়ে মাঘের শীত অগ্রাহ্য করে দিনরাত করেছিল
তারা বৃদ্ধ হয়েছে

অশ্বিনী

বৃষ্টিধোয়া গভীর নীল আকাশ
মাঝখান দিয়ে ছায়াপথ চলে গিয়েছে
আর সে দেখে এই নীচে কাশফুল কেমন চামর দোলাচ্ছে
মেষ রশির অশ্বিনীকুমার বড়ই কনফিউসড
একঘেয়ে পুব দিক থেকে সে কোন দিকে যে যাবে

কৃত্তিকা

পৃথিবীর সূর্য সোনালি বিভা ছড়াচ্ছে
আরো অনেক নিচে পুচকে চাঁদ রুপোলি ন্যাজ নাড়ছে
কৃত্তিকা চোখ সরু করে আরও আরও অনেক নিচে
দেখল আলোর কিছু বিন্দু
আমরা যে জ্বালাই আকাশপ্রদীপ

প্রশ্বন

পুব আকাশে মিথুন রাশির পাশে
দাড়িয়ে আছে প্রশ্বন পেটুক
মাঘে সে পুষ্যাকে বলে নলেন গুড়
পিঠে পায়েসের গল্প
পুষ্যাও কম যায় কিসে
পিকনিকের লোভ দিয়ে দিয়ে
প্রশ্বনের মাথাটা আরও আরও বিগড়ে দিচ্ছে

উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী

সিংহ রাশির হলেও এরা দুটি
মঘা’র মতন নয়
মৌমাছিরা ওদের গান গায়
ওরাও নতুন তামাটে পাতার বাঁশি বাজায়
কমলালেবুর মতন পৃথিবীর প্রতি
ওদের টান আলাদা…


কবি পরিচিতি

অতনু ভট্টাচার্য

অতনু ভট্টাচার্য

কবি অতনু ভট্টাচার্য (জন্ম – ১৯৭৪)। পিতা – সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য। মাতা – কৃষ্ণা ভট্টাচার্য। স্নাতক। ‘কুবোপাখি’ প্রকাশনা সংস্থাটির কর্ণধার। ঠিকানা – ১/১৩ সংহতি কলনি, পোস্ট – রিজেন্ট এস্টেট, কলকাতা-৭০০ ০৯২, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

প্রকাশিত কবিতার বইঃ অক্ষরে বোনা মুদ্রিত বিরহ(২০০৮); নিরাকৃত ভ্রাম্যমাণ তুমি (২০১২); নক্ষত্রমালা শিব ও শূন্যতা(২০১৪); অভিন্ন হৃদয়েষু ধুলো (২০১৪); পারমিতাকে ডাকছিলাম (২০১৬)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E