৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১২২০১৬
 
 ১২/১১/২০১৬  Posted by
কবি অজিতেশ নাগ

কবি অজিতেশ নাগ

অজিতেশ নাগের ৬টি কবিতা


শ্রমণকালে

আবারো কিছুটা স্তব্ধতা ফিরে এলো,
বেশ কিছু শতক আগে; শ্রমণকালের কিছু মূর্খ মুখ,
কিছুটা নির্বুদ্ধিতা স্তব্ধতার পায়ে বিসর্জন দিয়েছিল।

তারা শুধিয়েছিল, কি সুখ পাও রমণে?
মৃত্যুর অবিরাম পদধ্বনি বৈ তো কিছু অতিরিক্ত নয়,
আমি জানতাম এ বাক্য নিতান্ত প্রয়োজনে; কেননা –
তারা ব্যাঘ্রসংকুল জনপদে আশ্রিত হতে চেয়েছিল।

পরম নির্জন রাতে, আমি দেখা করি এক মূর্খ মুখের সাথে,
শুধোই, হে পবিত্র, প্রেমের বিনিময়ে দুটি হাতের স্পর্শ দাও,
স্তিমিত দৃষ্টির সামনে আমার কমনীয় বুকের দৃশ্য সাজাও,
আমি সুজাতার মত তুলে ধরব দেবভোগ্য পায়সান্ন।

মহা মূর্খ হাসে নাগরিক নির্লজ্জতায়,
উজ্জ্বল বাসনায় হানে সুতীক্ষ্ণ প্রহার।

নিষাদ রাত্রী শেষে,
আমার চৌকাঠ সাজে দুর্লেখ্য স্তব্ধতায়।

কুমারীর কমনীয় দেহ ডাকে প্রচন্ড উল্লাস!!


ডাকবেন না স্যার

ডাকবেন না স্যার, এখন আমাদের নতুন ক্লাস,
নতুন বন্ধু, খাস্তা বিস্কুটের গন্ধ, শ্লেটের দাগ মুছে যেতে দেবেন না প্লিজ।
বরফঠান্ডা কফিনে শুয়ে আফজল, নিষিদ্ধ বিছানার চাদর মোড়া,
ওকেও ডাকবেন না। ও স্বপ্ন দেখুক মোহিনীবাবুর জ্যামিতি ক্লাশের।

ডাকবেন না স্যার, এখনো বান্ধবীজ্ঞান সুপ্ত কমিকের পাতায়,
পাটিগণিতের ভেতরে বকুলের গন্ধ, গাছ বুড়ো হয়, শিকড়ে মরে না।
চন্দনস্যার আসবেন এইবার বেত হাতে, আমাদের সুষুপ্ত দুপুরের স্বাদ,
স্কুলের হাতখরচ সব আইসক্রিমে, হাতিঘোড়া বিস্কুটে গলে গেছে।

হাবুটা এখন অফিসফেরৎ স্কুলের দরজায় তাকিয়ে চায়,
এখনো মর্নিংপ্রেয়ারের ধুলো কাড়াকাড়ি করে দীর্ঘনিঃশ্বাস।
ডাকবেন না স্যার, আজ এত উঁচু ক্লাশে উঠে গেছি আমরা,
তাই হাত বাড়ালেই ব্ল্যাকবোর্ড বে-নাগাল, ভাঙা চক ঝাপসা।

ডাকবেন না স্যার, আপনার সাথীরা আঙুলের ফাঁকে হাওয়া,
আমার বন্ধুরা প্রানপনে মুখস্ত করে মোঘল যুগের ইতিকথা,
রানী পদ্মিনীর আত্মহত্যা ওরা এখনো কিন্তু মেনে নিতে পারে নি,
ক্লাসটেস্টের আগের রাত এখনো ঘুম চুরি করে প্রতিরাতে।

স্কুলের বেঞ্চ আর খেলার মাঠ পরস্পরকে টক্কর দেয়,
আমরা একে অন্যের সাথে আমসি, আচারের গল্প করছি,
আর ছুটির ঘণ্টা আহ্বান করে পা টেনে বাড়ি যাওয়া,
তাই ডাকবেন না স্যার, এখন স্মৃতির সাথে মারাত্বক ছক্কাপাঞ্জা।


সুমির জগৎ

গির্জার ঘণ্টাধ্বনিতে অনেক কষ্টে চোখ খুলে দেখলাম,
মৌটুসি পাখীদুটো ঠিক যে ডালে সঙ্গম করেছিল,
তার ঠিক নিচে পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাচ্ছে সুমি,
ও জানে না, ওকে কেউ বলেনি, প্রস্তরযুগ শেষ,
কত কিই তো শেষ হয়ে যায়, শেষ হবার বাসনায়।
তাই বোধহয় সুমিও জানে না; হয়ত ওকে জানতে দেওয়া হয় নি।

দুপুর পেরিয়ে গেলে, সুমি অনেকক্ষন জলের দিকে তাকিয়েছিল,
ও হয়ত আশা করছিল, নোয়ার নৌকা আসবে এ বার।
মৌটুসি পাখীদুটো যে ডালে তৃপ্তি পেয়েছিল,
সেদিকেও উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা কোন ডাইনোসর উড়ে গেল বুঝি।

সুমি গন্ধ নিতে জানে, ও কামিনীর গন্ধ পায় ডালে ডালে,
ও যত্নে তুলে রাখে স্খলিত ফুলের শবদেহ,
ওর পায়ের পাতা দুটো ডুবে যায় পদ্মার জলে, সেখানেও আশ্রমগন্ধ,
ওর উচ্চ যৌবনরেখা কখন যেন মৌটুসিকেও আনমনা করে দেয়।

গির্জার ঘণ্টাধ্বনি থেমে গেলে অনেকটা ঘুমানোর অবসরে দেখি,
সুমি একদৃষ্টে চেয়ে আছে আমার দিকে, নিথর, নিঃস্তব্ধ,
ওর নদীচোখ ফজরের নামাজ পড়ে, মোনাজাত করে নিশ্চুপে,
আমিও দেখলাম কেমন নিদ্রাহীন প্রস্তরযুগ পেরিয়ে যাচ্ছে সুমি।


আপাতত যেভাবে

আপাতত এই অবধি লিখে পাঠালাম তোমায়; বাকি অংশ দ্রুত।

আপাতত ঐটুকু, ক্রমশঃ অবধি যা লিখেছি মিলিয়ে মিলিয়ে চালাও সংসার।
গল্প খুবই চটকদার, উপন্যাসের চেয়ে কম কিছু নয় কোন অংশেই,
গত বুধবারে একটা কবিতার অংশ পাঠিয়েছিলাম,
ধারাবাহিকের পঞ্চম খন্ড, মৃদু দমখোলা কবিতা, অন্তিম বিকেলের…
ঠিক সেই মত মিলিয়ে মিলিয়ে যাপন করেছিলে নিশ্চয়ই সন্ধ্যেটুকু?

আটা, চাল, নারকেল তেল, যখন যা লাগছে জানিও…
তবে বেশী খরচা বাঁচিয়ে; কবিতার নায়িকার বেশী রান্নায় ত্রস্ত থাকতে নেই।
আচ্ছা, বেশ। বরং আগামী শনিবার একটা উন্মুক্ত ময়দানের গল্প দেব,
তুমি এক অযাচিত নায়কের সাথে বাদামভাজা খেয়ো।

গল্পের পরের শেষাংশে এক নির্জন রাত আছে।
….. বাকিটা ব্যক্তিগত।

‘তুমি?’

আমি? উপসংহারে তো প্রবেশ করছিই।


শেষ অবধি

শেষ অবধি সকাল হয়েই গেলো,
এতক্ষন তিস্তাপাড় উপুড় হয়ে শুয়েছিল,
চা-বাগানের এক একটা কুঁড়ি-পাতা ঝিমিয়ে এসেছিল,
বানারহাটের দিকে শেষ বাসটার চাকায় উড়েছিল দিনের শেষ ধুলো,
শেডট্রি গুলো মেলেছিল নির্বাক কথামালা,
ঝুমরি বস্তির সবকটা ঘর,
চাঁদের পাহাড় ঝাঁট দেওয়া সব ক’টা নরম নারী,
কাল শেষ রাতে হাড়িয়া সাক্ষী ছিল যে মাতনের।

আজ তারা সবাই জেগে উঠছে,
সবাই ফিরে আসতে চাইছে কমনীয় স্বাভাবিক ছন্দে,
আমি কিছুতেই আটকাতে পারছি না,
দু-হাত, সমগ্র শরীর বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিল।
ওরা জানে না,
সব কিছু স্বাভাবিক হলে… কি সুন্দর ভাবে ভোর হয়ে যাবে।


অগ্নিপথে

একমাত্র আগুন যা পারে পুড়িয়ে দিতে সব আত্মসম্মান,
একমাত্র আগুন যে এনে দিতে পারে সেই নিমর্ম চাহিদা,
যে চাহিদা এখন শবের অস্তিত্ব নিয়ে স্বপ্নপুরনের ব্যথা,
কোন অলিক দ্বীপে বাস করে সেই স্বপ্নের প্রেমিকা,
একমাত্র আগুন পারে মধ্যের সব জলটুকু শুষে নিতে।

আমাকে সেই আগুন নিতে দাও,
দগ্ধ হতে দেখি সীমাহীন মধ্যেটুকু,
বিরামহীন প্রদোষ যেন একটি একটি আগুনের বিন্দু।

এক অনন্তযাত্রীবাহী নৌকা ভিড়েছে ঘাটে,
আমি উঠে যাব রাত শেষ হবার আগেই,
ঊষাকাল শ্মশান হয়ে আছে এখনো ধিকিধিকি,
নিঃশব্দ পথটুকু হারাতে দিল না আমায়,
তাই আগুন দাও প্রিয়া, আমি মাঝের সামান্য যাত্রাপথটুকু পেরোতে চাই।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E